আপনি বুঝে বা না
বুঝে, অথবা কোনো প্রয়োজনে TIN সার্টিফিকেট করেছেন, আপনার আয় থাকুক বা না থাকুক, আয়কর
আইন ২০২৩ এর ধারা ১৬৬ ও ১৭১ অনুযায়ী, আপনাকে বাধ্যতামূলকভাবে প্রতি বছর আয়কর রিটার্ন
জমা দিতে হবে।
যদি আপনি ৩০ জুন
২০২৫ এর আগে TIN সার্টিফিকেট খুলে থাকেন, তবে আপনাকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রিটার্ন জমা
দিতে হবে।
TIN সার্টিফিকেট বাতিল:
১। আয়কর কর্কৃপক্ষ আপনার নিকট
হতে কোন প্রকার কর বা বকেয়া বা জরিমানা পাওনা নাই, তা প্রমানের জন্য আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ২৬২(১)(ক)(আ) অনুযায়ী পরপর বিগত ৩ (তিন) বৎসর করযোগ্য আয় শূন্য
(Zero) দেখাতে হবে। এর সাথে আপনাকে আবেদনের সময় উল্লেখ করতে হবে যে, শারীরিক অক্ষমতা,
অবসর গ্রহণ বা অন্য কোনো যৌক্তিক কারণে "ভবিষ্যতেও আপনার কোনো করযোগ্য আয় শূন্য
থাকিবেন।
২। এছাড়াও,
ধারা ২৬৪(৩)-এ বর্ণিত ৪৩টি সেবার কোনোটিই (যেমন: সচল ক্রেডিট কার্ড, ৫ লক্ষাধিক টাকার
সঞ্চয়পত্র, বাণিজ্যিক গ্যাস/বিদ্যুৎ সংযোগ বা কোনো কোম্পানির ডিরেক্টরশিপ) বর্তমানে
আমার নামে সচল নাই।
TIN Certificate থাকলেই কি ট্যাক্স বা কর দিতে হবে?
অনেকেই মনে
করেন, TIN Certificate থাকলেই
বাধ্যতামূলকভাবে কর
দিতে হয়।
বাস্তবে বিষয়টি
এমন নয়।
আয়কর নির্দেশিকা
২০২৫–২০২৬
অনুযায়ী নির্দিষ্ট
পরিমাণ আয়
অতিক্রম করলে
তবেই করদাতাকে
ন্যূনতম ট্যাক্স
প্রদান করতে
হয়। সহজভাবে
উল্লেখযোগ্য কয়েকটি
ক্ষেত্র নিচে
তুলে ধরা
হলো:
১। ব্যবসায়িক
আয়: যে
সকল ব্যবসায়ীর
বাৎসরিক সর্বমোট
আয়
পুরুষ: ৩,৫০,০০০
টাকা বা
তদূর্ধ্ব
নারী: ৪,০০,০০০
টাকা বা
তদূর্ধ্ব
তাদের ক্ষেত্রে
বাধ্যতামূলকভাবে ন্যূনতম
কর/ট্যাক্স
প্রদান করতে
হবে।
২। সরকারি
চাকরিজীবী:
সরকারি চাকরিজীবীদের
ক্ষেত্রে মাসিক
মূল বেতন
যদি—
পুরুষ: ২৬,৭৮৫
টাকা বা
তদূর্ধ্ব
নারী: ৩০,৩৫৭
টাকা বা
তদূর্ধ্ব
হয়, তাহলে
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির
বেতন থেকে
প্রযোজ্য নিয়ম
অনুযায়ী কর/ট্যাক্স
কর্তন করা
হবে।
৩। বেসরকারি
চাকরিজীবী:
বেসরকারি
চাকরিজীবীদের বাৎসরিক
সর্বমোট আয়
যদি—
পুরুষ: ৫,২৫,০০০
টাকা বা
তদূর্ধ্ব
নারী: ৫,৭৫,০০০
টাকা বা
তদূর্ধ্ব
হয়, তাহলে
তাদেরও বাধ্যতামূলকভাবে
কর/ট্যাক্স
প্রদান করতে
হবে।
গুরুত্বপূর্ণ
বিষয়:
যাদের আয়
উপরে বর্ণিত
সীমার নিচে,
তাদের কর
প্রদান করতে
হবে না।
তবে আয়কর
আইন, ২০২৩
এর ধারা
১৬৬ ও
১৭১ অনুযায়ী
TIN ধারী ব্যক্তিকে
প্রতি বছর
বাধ্যতামূলকভাবে ‘নন-ট্যাক্সেবল
রিটার্ন’ দাখিল
করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে
করদাতাকে তার
সকল মৌলিক
তথ্য রিটার্নে
সঠিকভাবে উপস্থাপন
করতে হবে।
রিটার্ন
(Income Tax Return):
গত ০১ জুলাই থেকে
পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এক বছরের মধ্যে একজন করদাতার মোট আয়, আয়ের উৎস, করযোগ্য
আয়ের পরিমাণ, পরিশোধিত কর, বিনিয়োগ, ব্যয়, সম্পদ ও দায় সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য নির্ধারিত
ফরমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এর নিকট জমা দেওয়াকে আয়কর রিটার্ন বলা হয়।
জিরো রিটার্ন:
প্রচলিত আইনে “জিরো রিটার্ন” নামে কোনো
রিটার্নের বিধান নেই। অনেকেই ভুলবশত এই নামে রিটার্নের কথা উল্লেখ করেন। যদি কোনো করদাতা
তথাকথিত “জিরো রিটার্ন” দাখিল করেন এবং পরবর্তীতে সেই ফাইল অডিটের জন্য নির্বাচিত হয়,
তবে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৫ (পাঁচ) বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান
রয়েছে।
বর্তমান আইনে রিটার্ন মূলত দুই (০২) প্রকার,
যথা—
১️। Tax Return: যে করদাতার আয় করযোগ্য
সীমার মধ্যে পড়ে এবং তিনি সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত আয়কর প্রদান করেন, তার দাখিলকৃত
রিটার্নকে Tax Return বলা হয়।
২️। Non-Taxable Return: যে করদাতার আয়
নির্ধারিত করযোগ্য সীমার নিচে থাকে এবং যার কোনো কর প্রদান করতে হয় না, তার দাখিলকৃত
রিটার্নকে Non-Taxable Return বলা হয়।
প্রথম রিটার্ন (First
Return) সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রথমবার রিটার্ন
দাখিল করার সময় কিছু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ক্লায়েন্টের প্রকৃত তথ্য ও সম্পদের বিবরণ
সঠিকভাবে উপস্থাপন না করে শুধুমাত্র নামমাত্র বা শূন্য তথ্য দেখিয়ে রিটার্ন জমা দিয়ে
থাকেন। এই ধরনের কার্যক্রম ক্লায়েন্টের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও সমস্যাজনক
হতে পারে।
প্রথম রিটার্ন দাখিলের সময় করদাতার সকল
প্রকার সম্পদের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ বিবরণ উল্লেখ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেমন:
১। ব্যাংক ডিপোজিট বা সঞ্চয়
২। নগদ অর্থ
৩। কৃষি জমি বা অকৃষি সম্পত্তি
৪। সঞ্চয়পত্র, এফডিআর বা অন্যান্য বিনিয়োগ
৫। যেকোনো স্থাবর বা অস্থাবর সম্পদ
প্রথম রিটার্নে এসব সম্পদ যথাযথভাবে উল্লেখ
করে রিটার্ন দাখিল করলে সম্পদের পরিমাণ যাই হোক না কেন, শুধুমাত্র সম্পদ দেখানোর জন্য
আলাদা করে কর দিতে হয় না।
তবে যদি প্রথম রিটার্নে সম্পদের সঠিক তথ্য
উল্লেখ না করা হয় এবং ভবিষ্যতে হঠাৎ করে বেশি সম্পদ প্রদর্শন করা হয়, তাহলে কর কর্তৃপক্ষের
কাছে এর উৎস ব্যাখ্যা করা কঠিন হয়ে যেতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কর বা জরিমানা
পরিশোধের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সুতরাং, প্রথম রিটার্ন দাখিলের সময় থেকেই
নিজের সকল সম্পদের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য উল্লেখ করা বুদ্ধিমানের কাজ এবং ভবিষ্যতের
জন্য নিরাপদ।
রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ।
১। চলতি কর বছরের জন্য আয়কর রিটার্ন
দাখিলের নির্ধারিত শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে সরকার প্রয়োজন মনে
করলে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে রিটার্ন জমা দেওয়ার সময়সীমা আরও বৃদ্ধি করতে পারে। চলতি ২০২৫-২০২৬ কর বছরেরর জন্য সর্বশেষ সরকার ৩১ মার্চ
২০২৬ পযন্ত সময় বৃদ্ধি করা হয়েছিল।
২। আয়কর আইন, ২০২৩ এর ধারা ২ এর দফা (২৩) এর উপ-দফা (গ) কোনো স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতা (Individual Taxpayer) যিনি পূর্বে কখনো রিটার্ন দাখিল করেননি, তার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আয়বর্ষ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৩০ জুন তারিখটিই হবে রিটার্ন দাখিলের শেষ দিন।
অডিটের জন্য করণীয় (সংক্ষেপে)।
১। রিটার্নে প্রদর্শিত তথ্যের যথাযথ প্রমাণ
থাকতে হবে; মনগড়া তথ্য দেওয়া যাবে না।
২। রিটার্নের সব তথ্যের কপি নিজের কাছে
সংরক্ষণ করতে হবে।
৩। রিটার্ন ভুল ছাড়া জমা দিতে হবে—ভুল
থাকলেও ফাইল অডিটে পড়তে পারে।
৪। রিটার্ন যেখানে সেখানে বা অদক্ষ কারো
মাধ্যমে জমা দেওয়া যাবে না; এটি ডাটা এন্ট্রি নয়, আইনগত প্রক্রিয়া।
সামান্য অসচেতনতাও
আপনার আর্থিক
ঝুঁকি বাড়িয়ে
দিতে পারে।
সম্পদ: ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত সম্পদের উপর কোন ট্যাক্স বা সারচার্জ নেই। তাই পরবর্তী বা ভবিষ্যৎ রিটার্নের কথা মাথায় রেখে জিরো রিটার্ন দেওয়ার ক্ষেত্রেই বেশি সচেতন ও সতর্ক থাকা উচিৎ।
করদিবস পরবর্তী সময়ে রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে
জরিমানা। আয়কর আইন-২০২৩ এর ধারা ১৭৪ অনুযায়ী আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট সময় (Tax day অর্থাৎ ৩০শে নভেম্বর) অথবা সরকার কর্তৃক নির্দিষ্ট সময় অতিবাহিত হওয়ার পর
নিচের নিয়ম অনুযায়ী জরিমানা প্রদান
করতে হবে:
১। করযোগ্য (Taxable) রিটার্নের ক্ষেত্রে। করদিবস পার হয়ে গেলে প্রতি মাসের বিলম্বের জন্য
মূল করের ওপর ৪% হারে অতিরিক্ত বিলম্ব কর যোগ হবে, যা সর্বোচ্চ ২৪ মাস (বা ৯৬%) পর্যন্ত
হতে পারে।
২। করমুক্ত/নন-ট্যাক্সেবল/জিরো রিটার্নের
ক্ষেত্রে। যদি করদাতার আয় করসীমার নিচে হয়, তবে এই ধারার গাণিতিক সূত্র অনুযায়ী তার
ওপর কোনো বিলম্ব কর বা জরিমানা আরোপ হবে না। তবে, আয়কর কর্তৃপক্ষ চাইলে ধারা ২৬৬ (১)
অনুযায়ী করদাতার ওপর এককালীন সর্বোচ্চ ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত জরিমানা আরোপ করতে পারেন।
রিটার্ন দাখিলে ব্যর্থতার জন্য জরিমানা: আয়কর আইন-২০২৩ এর ধারা ২৬৬(১) কোনো ব্যক্তি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া নির্দিষ্ট ধারাসমূহের অধীনে রিটার্ন
জমা দিতে ব্যর্থ হলে, উপকর কমিশনার তার ওপর জরিমানা আরোপ করতে পারবেন। সর্বশেষ নিরূপিত
আয়ের উপর ধার্যকৃত করের ১০% (তবে এটি সর্বনিম্ন ১,০০০ টাকা হবে)। ব্যর্থতা অব্যাহত
থাকলে প্রতিদিনের জন্য আরও ৫০ টাকা করে।
এই জরিমানার মোট পরিমাণ নিচের সীমাকে অতিক্রম করতে পারবে নাঃ
ক। নতুন করদাতা হলে (যাদের আগে কখনো কর নির্ধারণ হয়নি): সর্বোচ্চ ৫,০০০
টাকা।
খ। পুরানো করদাতা হলে (যাদের আগে কর নির্ধারণ হয়েছে): সর্বশেষ করের ৫০%
অথবা ১,০০০ টাকা, এই দুটির মধ্যে যেটি বেশি, সর্বোচ্চ তত টাকা।
রির্টানে জেনেশুনে মিথ্যা তথ্যের সাজা: আয়কর আইন-২০২৩ এর ধারা ৩১৩ অনুযায়ী রির্টানে কোন তথ্য বা বিবৃতি জেনেশুনে মিথ্যা প্রদান করলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের সশ্রম কারাদন্ড বা অর্থদন্ড হতে পারে।
কর রেয়াত: কর রেয়াত হলো একটি সুবিধা, যে যেখানে করদাতা বিনিয়োগ বা ব্যয় করলে তার মোট ট্যাক্স বা কর থেকে সরাসরি একটি অংশ কমে যায়। অর্থাৎ আয়কর নির্ধারণের পর মোট যে পরিমাণ কর দিতে হবে, তার থেকে নির্দিষ্ট অংশ হ্রাস পায়।
অডিট: আপনি যে তথ্য আয়কর ফাইলের অনলাইনের মাধ্যমে NBR এ জমা দিয়েছেন, তা অডিটের মাধ্যমে যাচাই করে দেখবে সব সঠিক দিয়েছেন কিনা। অসত্য তথ্য দিলে জরিমানা এবং শাস্তির মাধ্যমে তার শুধ্যাচার করা হবে।